বিশেষ প্রতিবেদন:
ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে গড়াতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিমান চলাচল, পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২.৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়ে ১০১ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের মাইন আতঙ্ক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই পথে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ছে বিমান শিল্পে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২০–৩০ শতাংশই জ্বালানি খরচ। ফলে তেলের দাম বাড়লে বিমান টিকিটের দামও বাড়া প্রায় অনিবার্য।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ভাড়া বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আবার নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছে বিমান গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিরিয়াম। এতে আকাশপথে সিটের সংকট তৈরি হয়ে ভাড়া আরও বাড়তে পারে।
তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সংকট শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার ও কৃষি-সম্পর্কিত পণ্য পরিবহনও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ ব্যয় আরও বাড়বে এবং অনেক এয়ারলাইন্স লোকসানি রুট বন্ধ করতে পারে। এতে টিকিটের সংকট তৈরি হয়ে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কত দ্রুত থামানো যায় এবং হরমুজ প্রণালির জ্বালানি সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হয় তার ওপর।

